
অব্যবস্থাপনার দায়ে কি শুধুই ‘তালা’?
আদ-দ্বীন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠছে নীতিগত প্রশ্ন
——————————————————————————-
দেশে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হচ্ছে অসংখ্য জীবন, লঞ্চডুবিতে ঘটছে ভয়াবহ প্রাণহানি, আর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ঝরছে শত শত মানুষের প্রাণ। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এসব বড় বড় দুর্ঘটনার পর কি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে? যদি না হয়, তবে রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিলের মতো এমন চূড়ান্ত ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত কেন? এই প্রশ্ন এখন চিকিৎসা খাত ও সুশীল সমাজের মধ্যে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালে কয়েকজন নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সন্তানের লাশ নিয়ে মা-বাবার আহাজারি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং মর্মান্তিক। এই ঘটনায় যদি কারো অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা গাফিলতি প্রমাণিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া উচিত—এ বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। আমরাও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কয়েকজনের ভুল বা একটি বিভাগের অব্যবস্থাপনার দায়ে পুরো একটি হাসপাতালকে বন্ধ করে দেওয়াই কি একমাত্র সমাধান?
সংস্কার নাকি ‘তালা’: সঠিক পথ কোনটি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে সমস্যা থাকে, তাহলে কি সেই সমস্যার সমাধান, সংশোধন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়? একটি চালু হাসপাতাল বন্ধ করে দিলে তার প্রভাব শুধুমাত্র মালিকপক্ষ বা অভিযুক্ত কর্মচারীদের ওপর পড়ে না; এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন সেখানে চিকিৎসাধীন শত শত সাধারণ রোগী এবং কর্মরত হাজারো নিরীহ কর্মচারী।
আদ-দ্বীন হাসপাতালের মতো একটি বড় অবকাঠামো, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা পান, সেটি হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য খাতের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন অনেকে। একটি বিভাগের সমস্যার কারণে পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়াকে ‘মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলা’র মতো সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন অনেক ভুক্তভোগী।
আইন ও মানদণ্ডের প্রয়োগ: প্রশ্ন সমতার
এখানে আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন থেকে যায়, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে কি সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই নিয়ম ও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়? নাকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কঠোরতা আকাশচুম্বী, আবার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা বড় বড় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে রহস্যজনক নীরবতা দেখা যায়?
সড়ক দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনায় মালিকপক্ষের দায় প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়া হয় বা ছোট শাস্তি দিয়ে পার করে দেওয়া হয়। অথচ একটি হাসপাতালের ক্ষেত্রে ত্বরিতগতিতে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। জনগণ বিচার চায়, জবাবদিহি চায়, কিন্তু একই সঙ্গে সমান ও নিরপেক্ষ ন্যায়বিচারও দেখতে চায়।
চূড়ান্ত জিজ্ঞাসা: সিদ্ধান্ত কি ন্যায়সংগত?
আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—আদ-দ্বীন হাসপাতাল পুরোপুরি বন্ধের এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই ন্যায়সংগত ছিল? নাকি প্রতিষ্ঠানটিতে যারা দোষী, শুধু তাদের শাস্তির আওতায় এনে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে সংস্কার ও সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল?
চিকিৎসা সেবা একটি স্পর্শকাতর খাত। এখানে যেমন জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তেমনি একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। আদ-দ্বীন বন্ধের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ মানদণ্ড নিয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।