
এমআরএ’র নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ টিএমএসএসের বিরুদ্ধে:
দৈনিক সমাজ নিউজ ::
দেশের অন্যতম বৃহৎ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস)-এর বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)-এর বিভিন্ন নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ, মৃত গ্রাহকের পরিবারের সঞ্চয় ফেরতে দীর্ঘসূত্রতা এবং কর্মীদের অতিরিক্ত সময় কাজ করানোর অভিযোগও সামনে এসেছে।
টিএমএসএসের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৫৬টি শাখায় ১৫ লাখের বেশি ঋণগ্রহীতা রয়েছে।
পিকেএসএফ, ব্যাংক ঋণ এবং নিজস্ব তহবিলের সমন্বয়ে পরিচালিত এ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম দেশের বৃহৎ মাইক্রোফাইন্যান্স নেটওয়ার্কগুলোর একটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পিকেএসএফের অংশীদার সংস্থাগুলোর মধ্যে ঋণ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও টিএমএসএস শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পরও পণ্য বিক্রির অভিযোগ:
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি ২০২৩ সালের ৪ জুলাই সার্কুলার লেটার নং-৭৬ জারি করে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে পণ্য বিক্রি বা সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্দেশনার পরও টিএমএসএস বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য কিস্তিতে বিক্রি করে আসছে।
এনজিওটির চকসূত্রাপুর ব্রাঞ্চ থেকে খুব দ্রুত নয়টি ফ্রিজ বিক্রি হয়ে যাওয়ায় সুজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি ফ্রিজ কিনতে পারেননি। তবে উপর শহর এলাকায় তাদের একটি গ্রাহকের কাছে এক মাস আগে নেওয়া একটি ফ্রিজ আছে। যার কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না গ্রাহক। গ্রাহকের নামে ৪৫ হাজার টাকা টিএমএসএস থেকে ঋণ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে ফ্রিজটি। সুজনকে শুধুমাত্র রানিং কিস্তি থেকে পরিশোধ করে ফ্রিজ টি নেওয়ার জন্য বেশ অনুরোধ করেন ওই শাখার ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম।
এমআরএ এর নিষেধ থাকার পরেও পণ্য বিক্রি করার বিষয়টি স্বীকার করে টিএমএসএস এর উপ-নির্বাহী পরিচালক সোহরাব আলী খান বলেন আমরা এই কার্যক্রম খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দেবো।
ঋণের আগে সঞ্চয় ও অতিরিক্ত চার্জের অভিযোগ:
একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, ১ লাখ টাকা ঋণ নিতে হলে আগে ১০ শতাংশ সঞ্চয় জমা রাখতে হয়। ফলে গ্রাহক হাতে পান ৯০ হাজার টাকা, অথচ কিস্তি পরিশোধ করতে হয় পুরো ১ লাখ টাকার ওপর হিসাব করে।
একজন শাখা ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সঞ্চয়ের পাশাপাশি স্ট্যাম্প, স্বাস্থ্য কার্ড, বীমা ও অন্যান্য খাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়।”
এ বিষয়ে সোহরাব আলী খান বলেন, “১০ শতাংশ নয়, ক্ষেত্রবিশেষে আড়াই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে নেওয়া হয়।”
ক্ষুদ্রঋণ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ বিতরণের আগে বাধ্যতামূলক অর্থ কেটে রাখার বিষয়টি নিয়ন্ত্রক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা এমআরএ’র পর্যালোচনার বিষয়।
মৃত গ্রাহকের পরিবারের অপেক্ষা
দুই মৃত ঋণগ্রহীতার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, ৮ থেকে ১০ মাস আগে আবেদন করলেও তারা এখনো সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত পাননি।
টিএমএসএসের উপ-নির্বাহী পরিচালক বলেন, “গ্রাহকের সঞ্চয় ফেরতের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কর্মীদের অভিযোগ করেন
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করা
প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেন, তাদের সকাল ৯টা থেকে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ঋণ আদায়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্য কার্ড, পণ্য বিক্রি ও বিভিন্ন তহবিল সংগ্রহের দায়িত্বও পালন করতে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য কোনো ওভারটাইম ভাতা দেওয়া হয় না।
তাদের দাবি, কিস্তি আদায়ে চাপের মুখে অনেক সময় নিজস্ব অর্থ দিয়েও সাময়িকভাবে কিস্তি সমন্বয় করতে বাধ্য হন কেউ কেউ।
অভিযোগের বিষয়ে সোহরাব আলী খান বলেন, “কর্মীদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে কর্মীরা নিজেদের অর্থ দিয়ে গ্রাহকের কিস্তি পরিশোধ করুক, এমন কোনো নির্দেশনা নেই।”
৪০০ কোটি টাকার খারাপ ঋণ
টিএমএসএসের উপ-নির্বাহী পরিচালক জানান, প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছর এমআরএ’র কাছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার খেলাপি বা আদায়-অযোগ্য ঋণ অবলোপনের আবেদন করেছে।
তার ভাষ্য, “দীর্ঘদিন ধরে যেসব ঋণ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী অবলোপনের জন্য দাবি করা হয়েছে।”
এত বড় অঙ্কের অবলোপনের আবেদন প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমআরএ এর বক্তব্য:
ক্ষুদ্রঋণের টাকা দিয়ে বঙ্গ বন্ধু মটেল, গেট, এল এম জি সহ অনেক কিছু করার অনুমতি চেয়েছিল টিএমএসএস। কিন্তু এসবের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলারলিটি অথরিটি এম আর এর নির্বাহী পরিচালক ইয়াকুব হোসেন। তবে দু একটি জায়গায় তারা ক্ষুদ্রঋণের টাকা ফাইন্যান্স করেছে খুব দ্রুত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা ফেরত নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন এমআরএ। পণ্য বিক্রি অন্যায় তাই আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান এমআরএর এই কর্মকর্তা। ৪০০ কোটি টাকার অবলোপন এর বিষয়ে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান এমআরএ এর নির্বাহী পরিচালক।
শ্রম অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিচালক এ কে এম সালাউদ্দিন বলেন, “কোনো কর্মী শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হলে ১৬৩৫৭ নম্বরে বিনামূল্যে অভিযোগ করতে পারেন। পরিচয় গোপন রেখেও অভিযোগ গ্রহণ করা হয় এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
অনুসন্ধানে যা উঠে এলো
নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি, ঋণ বিতরণের আগে অর্থ কেটে রাখা, সঞ্চয় ফেরতে বিলম্ব, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং বিপুল পরিমাণ খারাপ ঋণ অবলোপনের আবেদন—এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।