
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।
দৈনিক সমাজ নিউজ :
চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন সুইট। আওয়ামী লীগের সাঘাটা ইউনিয়ন সভাপতি। সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসান রিপনের খাস লোক। তার ক্ষমতার কিছু অংশ ব্যবহার করেই এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে আসছেন একযুগ ধরে। সম্প্রতিক তার কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানে নামে মানবজমিনের এই প্রতিবেদক। অনেক বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। তিনি সরকারের বিভিন্ন ধরনের ভাতাভোগীদের কার্ড নিজের কাছেই রেখে দেন। টাকা উত্তোলন করেন নিজেই। তারপর ইচ্ছেমতো ভাতাভোগীদের হাতে সামান্য টাকা দিয়ে বিদায় করে দেন। এভাবে দীর্ঘ তিনবার চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিবন্ধীদের স্মার্ট কার্ড, বিধবাভাতা, বয়স্কভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ নানা ধরনের ভাতাভোগীদের কার্ড থাকে চেয়ারম্যানের কাছেই। শুধু তাই নয় ভিজিএফ, ভিজিডির চাল উত্তোলন ও টিসিবির পণ্য উত্তোলনের মতো সহজ বিষয়গুলোও চেয়ারম্যান তার পেটুয়া বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন। অর্থাৎ কয়েক হাজার অসহায় মানুষের ভাতা চেয়ারম্যান উত্তোলন করে থাকে। উত্তোলনের পর মন চাইলে নামমাত্র কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। মোটা অঙ্কের সব টাকা চেয়ারম্যান নিজেই রেখে দেন। জানা গেছে এসব টাকা দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করেন দুই এরেন দুই শত যুবকের একটি পেটুয়া বাহিনী। এ ছাড়াও চেয়ারম্যানের রয়েছে আইভি রহমান নামের এক নারী নেত্রী। তার নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি টিম আছে। যারা স্থানীয় প্রভাবশালী একটি এনজিওর চাকরির বরাত দিয়ে বিভিন্ন ভাতাভোগীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে নানাভাবে। ভিক্টিমাইজ করে চেয়ারম্যানের পকেটে কোটি কোটি টাকা ঢুকানোর সুযোগ করে দেয়।
সুইটের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। স্থানীয়রা বলেন, নানা অপকর্মের মাস্টার মাইন্ডার তিনি। যমুনা থেকে অবৈধভাবে দৈনিক ১০ লক্ষাধিক টাকার বালু উত্তোলন, যমুনার চর ও জমি দখল, নানা ধরনের সিন্ডিকেটে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষদের জিম্মি করা, ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ, ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজিসহ একক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি। শুধু তাই নয় মানবজমিনের এই প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর নানা তথ্য। বর্তমানে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে পানিপথের বিভিন্ন বাহনগুলোও এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন স্থানের পানিপথেও শুরু হয়েছে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি। এসব তথ্য অনুসন্ধানে গিয়ে কথা হয় সাঘাটা গ্রামের প্রতিবন্ধী আশরাফ উদ্দীনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সুইট চেয়াম্যানের নারীকর্মী আইভি, প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেয়ার নামে আমার কাছে থেকে প্রথমে তিন হাজার টাকা নেয়। সে অনুযায়ী স্মার্ট
কার্ডও হয়ে যায়। তবে এই কার্ড চোখে দেখলেও আজও হাতে পাইনি। পরবর্তীতে দশ হাজার ২০০ টাকা এসেছিল কিন্তু ওই টাকা আমাকে দেয়নি। এ বিষয়ে পরে আইভির কাছে গেছিলাম কিন্তু তিনি বলেন, আমি তিন হাজার টাকা নিছি কার্ড করে দেয়ার জন্য, কার্ড করে দিছি। পরে যে টাকা এসেছে ওসব চেয়ারম্যান নিছে। এই বিষয় নিয়ে এরপরে আমার কাছে যেনো আর না আসা হয়। সাঘাটা গ্রামের প্রতিবন্ধী এজাদুল ইসলাম বলেন, আমার থেকে আইডি কার্ড করে দেয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা নিছে। কার্ড হয়ে যাবার পরে ও দফায় টাকা এসেছে এক টাকাও আমায় দেয়নি। স্মার্ট কার্ড ও সিম কার্ড চেয়ারম্যানের কাছেই থাকে ওরাই সব তুলে নেয়। প্রতিবন্ধী আব্দুল হাই সরদার বলেন, আমি মৃগী রোগী। মুত্যুর আগের দিন পর্যন্ত প্রতিদিন আমাকে জিপটল সিআর নামের টেবলেট খেতেই হবে। মনে করছিলাম প্রতিবন্ধী কার্ড হয়ে গেল এখন তিন মাস পরপর যে টাকা পাবো তা দিয়ে কমপক্ষে ওষুধটা কিনতে পারবো কিন্তু আমও গেল ছালাও গেল। কার্ড কার্ড করে দেয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা দিছিলাম সেটাও গেল এখন যে টাকা আসে তা তো চেয়ারম্যানরাই তুলে নেয়। কী আর করার। কিছু বলতে গেলেই পিটায়ে হাত-পা ভেঙে দিবে। সে জন্যেই আর যাইনে। এমন অর্ধশত প্রতিবন্ধী, বিধবা, বয়স্ক ও মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগীর সঙ্গে ২০১৫ কথা বলে উঠে আসে এই নির্মম চিত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, হাজার হাজার ভাতাভোগীর কার্ড চেয়ারম্যানের কাছেই থাকে। সময়মতো ওনার লোকজন এসেই এসব টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে অভিযুক্ত আইভি রহমান বলেন, আমি এসকেএস নামক একটি এনজিওতে কাজ করি। এগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আর টাকা নেয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। আমি কিছু কাগজপত্র গোলাম মেম্বারকে দিয়েছিলাম। তিনি কী করেছেন জানি না। কথা হয় মোশাররফ হোসেন সুইটের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ একেবারেই মিথ্যা। কারণ একজনের ভাতার টাকা অন্য কেউ উঠানোর সুযোগ নেই। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ভোটের সময় আমাদের এখানে দুটি দল তৈরি হয়ে গেছে। তারাই আমার বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র করছে। এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। আমাদের কাছে ভুক্তভোগীরা লিখিতভাবে অভিযোগ করলে তা যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসাহাক আলী বলেন, এই বিষয়টি আপনার কাছেই জানলাম। এ পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। আমরা বিষয়টি তদন্ত করবো এবং সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।